বছরের অন্য দিনের মতোই দেখতে ২৩ সেপ্টেম্বর। কিন্তু পৃথিবীর জন্য দিনটি একটু আলাদা। এদিন সূর্য এমন একটি অবস্থানে পৌঁছায়, যখন তার কেন্দ্র পৃথিবীর বিষুবরেখার সমতল অতিক্রম করে। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই ঘটনাকেই বলা হয় Equinox বা বিষুব।

২০২৬ সালের September Equinox ঘটবে ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৫ মিনিটে। এই মুহূর্তের পর উত্তর গোলার্ধে ধীরে ধীরে দিনের দৈর্ঘ্য কমতে শুরু করবে, আর রাত হবে দীর্ঘ। অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধে ঘটবে এর বিপরীত পরিবর্তন।

‘Equinox’ শব্দটির উৎস ল্যাটিন ভাষায় থেকে। Aequus অর্থ সমান এবং nox অর্থ রাত। এই নাম থেকেই অনেকের ধারণা, Equinox-এর দিন পৃথিবীর সর্বত্র ১২ ঘণ্টা দিন ও ১২ ঘণ্টা রাত থাকে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।

Equinox আসলে কোনো পুরো দিনের নাম নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মুহূর্ত। পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় বছরে দু'বার এমন অবস্থায় আসে, যখন সূর্যের কেন্দ্র বিষুবরেখার সমতলের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। মার্চ ও সেপ্টেম্বর এই দুই সময়েই ঘটে Equinox।

পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক বেশ গভীর। আমাদের গ্রহের ঘূর্ণন অক্ষ কক্ষপথের সমতলের তুলনায় প্রায় ২৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি হেলে আছে। পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় এই হেলনের কারণেই বছরের বিভিন্ন সময়ে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে সূর্যের আলো ভিন্ন কোণে পড়ে।

যে সময় উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি হেলে থাকে, তখন সেখানে গ্রীষ্মকাল। কয়েক মাস পর একই অবস্থান দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে চলে যায় এবং সেখানে গ্রীষ্ম শুরু হয়। Equinox হলো এই বার্ষিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সন্ধিক্ষণ।

সেপ্টেম্বরের Equinox উত্তর গোলার্ধের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনার মাধ্যমে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক শরতের শুরু ধরা হয়। একই সময়ে দক্ষিণ গোলার্ধে শুরু হয় জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বসন্ত।

তবে Equinox-এর দিনেই যে তাপমাত্রা হঠাৎ বদলে যাবে বা আবহাওয়ায় বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যাবে, এমন নয়। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঋতুর শুরু এবং আবহাওয়াবিদদের ব্যবহৃত ঋতুর হিসাব এক বিষয় নয়। Equinox মূলত সূর্য ও পৃথিবীর অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা।

এবার আসা যাক সবচেয়ে প্রচলিত প্রশ্নে, Equinox-এর দিন কি সত্যিই দিন ও রাত সমান হয়?

উত্তর হলো, সব জায়গায় ঠিক ১২ ঘণ্টা করে নয়।

এর একটি কারণ সূর্যের নিজস্ব দৃশ্যমান আকার। সূর্য আকাশে একটি বিন্দুর মতো দেখা যায় না। একটি গোলাকার চাকতি হিসেবে দেখা যায়। সূর্যের ওপরের প্রান্ত দিগন্তে উঠলেই আমরা সূর্যোদয় হিসেবে সময় গণনা করি। একইভাবে সূর্যের পুরো চাকতি দিগন্তের নিচে চলে যাওয়ার পর সূর্যাস্ত ধরা হয়।

এর সঙ্গে রয়েছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আসার সময় সূর্যের আলো সামান্য বাঁক নেয়। এই ঘটনাকে বলা হয় atmospheric refraction বা বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণ। এর ফলে সূর্য প্রকৃতপক্ষে দিগন্তের কিছুটা নিচে থাকলেও পৃথিবী থেকে তার আলো দেখা যায়।

এই কারণেই Equinox-এর দিনেও কোনো নির্দিষ্ট স্থানে দিনের আলো ও অন্ধকারের সময় ঠিক ১২ ঘণ্টা করে নাও হতে পারে।

দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য প্রায় সমান হওয়ার ঘটনাকে বোঝাতে Equilux শব্দটিও ব্যবহার করা হয়। তবে Equinox এবং Equilux এক নয়। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ১২ ঘণ্টার কাছাকাছি দিন ও রাত হওয়ার সময়টি Equinox-এর কয়েক দিন আগে বা পরে হতে পারে। স্থানভেদে এই পার্থক্যও বদলে যায়।

বাংলাদেশ উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত। তাই ২৩ সেপ্টেম্বরের Equinox-এর পর এ দেশে দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে কমবে এবং রাতের দৈর্ঘ্য বাড়বে। শীতের দিকে এগোতে থাকলে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হবে।

Equinox-এর সময় সূর্যের আলো দুই গোলার্ধে প্রায় সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় তৈরি হয়। বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলোতে অবশ্য সারা বছরই দিন ও রাতের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য তুলনামূলকভাবে কম থাকে। আবার মেরু অঞ্চলে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়, সেখানে বছরের একটি বড় সময়জুড়ে দিন বা রাতের দৈর্ঘ্যে ব্যাপক পার্থক্য থাকতে পারে।

আরেকটি বিষয়ও বেশ মজার। Equinox প্রতি বছর একই তারিখে ঘটে না। সাধারণত March Equinox ১৯ থেকে ২১ মার্চের মধ্যে এবং September Equinox ২২ বা ২৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে হয়ে থাকে। পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণের প্রকৃত সময় এবং আমাদের ক্যালেন্ডারের হিসাব পুরোপুরি এক না হওয়ায় এই তারিখে সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়।

২০২৬ সালের September Equinox-এর নির্দিষ্ট সময় হলো ২৩ সেপ্টেম্বর ০০:০৫ UTC। বাংলাদেশ UTC-এর চেয়ে ছয় ঘণ্টা এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশে তখন ঘড়িতে বাজবে সকাল ৬টা ৫ মিনিট।

তাই ২৩ সেপ্টেম্বরকে শুধু ‘দিন-রাত সমান হওয়ার দিন’ হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটিকে বোঝা হবে না। এটি আসলে পৃথিবীর কক্ষপথ, তার ঘূর্ণন অক্ষের হেলন এবং সূর্যের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মুহূর্ত।

পৃথিবী তার কক্ষপথে ঘুরতে থাকবে, সূর্যের আলো পড়ার কোণ বদলাতে থাকবে এবং তার সঙ্গে বদলাবে দিনের দৈর্ঘ্য। সেই দীর্ঘ পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হিসেবেই প্রতি বছর ফিরে আসে Equinox।

তথ্যসূত্র: NASA, Timeanddate