কম্পিউটার বলতে আমাদের চোখের সামনে সাধারণত সিলিকন চিপ, ট্রানজিস্টর, সার্কিট আর বিদ্যুতের কথা আসে। কিন্তু ভবিষ্যতের কম্পিউটার হয়তো সবসময় এমন নাও হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এবার DNA অণু ব্যবহার করে এমন একটি molecular computer তৈরি করেছেন, যা পানির মধ্যে থাকা DNA-এর পারস্পরিক ক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের হিসাব করতে পারে।
আয়ারল্যান্ডের Maynooth University-এর গবেষকদের তৈরি এই ব্যবস্থাটির নাম Scaffolded DNA Computer বা SDC। গবেষণাটি ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত হয়েছে।
DNA দিয়ে আবার কম্পিউটার কীভাবে সম্ভব?
DNA-কে আমরা সাধারণত জীবদেহের জেনেটিক তথ্য বহনকারী অণু হিসেবে জানি। DNA-এর চারটি মূল বেস হলো—Adenine (A), Thymine (T), Cytosine (C) এবং Guanine (G)।
গবেষকেরা এই অণুগুলোর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকেই গণনার কাজে ব্যবহার করেছেন।
তাদের তৈরি ব্যবস্থায় একটি দীর্ঘ DNA strand একটি ধরনের scaffold বা কাঠামো হিসেবে কাজ করে। এর সঙ্গে আরও ছোট DNA strand যুক্ত হয়। এসব strand নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ও বিচ্ছিন্ন হতে থাকে।
এই DNA strand-গুলোর কোনটি কোথায় যুক্ত হবে, সেই নিয়মের মধ্যেই কম্পিউটারের program এবং input নির্ধারণ করা থাকে। শেষ পর্যন্ত DNA অণুগুলো এমন একটি অবস্থায় পৌঁছায়, যেটিকে কম্পিউটেশনের ফল হিসেবে পড়া যায়।
তাহলে এক ফোঁটা পানির ভূমিকা কী?
গবেষকদের DNA computer কোনো ছোট electronic chip নয়। DNA strand-গুলোকে পানিতে থাকা একটি solution-এর মধ্যে রাখা হয়। সেখানে লবণসহ নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরিবেশ তৈরি করা হয়।
এরপর তাপ দেওয়া এবং ঠান্ডা করার মাধ্যমে DNA strand-গুলোকে নিজেদের মধ্যে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। গবেষণার ভাষায় এটি একটি annealing process।
সহজভাবে বললে, DNA অণুগুলোকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে তারা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে হতে ধীরে ধীরে এমন একটি configuration-এ পৌঁছায়, যেটি শক্তির দিক থেকে সবচেয়ে সুবিধাজনক এবং একই সঙ্গে সঠিক গণনার ফল নির্দেশ করে।
তাই “এক ফোঁটা পানিতে কম্পিউটার” বললে বিষয়টি সহজে বোঝানো যায় ঠিকই, কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে পানি নিজে কম্পিউটিং করছে না। পানির মধ্যে থাকা বিপুল সংখ্যক DNA molecule-ই মূল কাজটি করছে।
কী ধরনের হিসাব করতে পেরেছে?
গবেষকেরা তাদের DNA computer দিয়ে একাধিক molecular program পরীক্ষা করেছেন।
এর মধ্যে ছিল যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ। এছাড়া parity detection-এর মতো logical operation এবং ২৫-বিট সংখ্যার যোগসহ আরও জটিল computation করা হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফলগুলোর একটি হলো, গবেষকেরা ১০০-বিট computation প্রদর্শন করতে পেরেছেন। গবেষণায় মোট ১০টি molecular program পরীক্ষা করা হয়েছে এবং ৭০০টিরও বেশি computation চালানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ ছাড়াই কীভাবে হিসাব করে?
প্রচলিত কম্পিউটারে transistor বৈদ্যুতিক signal ব্যবহার করে ০ এবং ১-এর মতো binary state পরিবর্তন করে। DNA computer-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা।
এখানে DNA strand-এর binding এবং unbinding-এর মধ্য দিয়েই তথ্য প্রক্রিয়াকরণ হয়।
গবেষকেরা এমনভাবে DNA system তৈরি করেছেন যাতে সঠিক ফলাফলটি energetically সবচেয়ে favourable অবস্থায় থাকে। ফলে সিস্টেমটি ধীরে ধীরে সেই অবস্থার দিকে এগোয়।
এটিকে অনেকটা পাহাড়ের ওপর থেকে একটি বল ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায়। বলটি নানা পথে চলতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিচের দিকে সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছায়। গবেষকেরা এই ধারণাটিকে thermodynamically favoured computation হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এটি কি বর্তমান কম্পিউটারের চেয়ে দ্রুত?
না। এখানেই একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি।
DNA computer-এর এই সাফল্য মানে এই নয় যে এটি এখন ল্যাপটপ বা আধুনিক CPU-এর চেয়ে দ্রুত। বরং এর লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গবেষণায় কিছু ছোট computation প্রায় এক মিনিটের মধ্যেও সম্পন্ন হয়েছে। তবে বড় ও জটিল computation-এর ক্ষেত্রে অনেক বেশি সময় লেগেছে। গবেষকেরা নিজেরাই উল্লেখ করেছেন যে বড় সিস্টেমে computation ধীর হয়ে যায়।
অর্থাৎ এটি এখনই আপনার কম্পিউটারের CPU বা GPU-কে প্রতিস্থাপন করতে যাচ্ছে এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
তাহলে DNA computer নিয়ে এত আলোচনা কেন?
কারণ এই প্রযুক্তি কম্পিউটিংয়ের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতি দেখাচ্ছে।
প্রচলিত কম্পিউটারে আমরা hardware-এর মধ্যে electrical signal চালিয়ে computation করি। এখানে বিজ্ঞানীরা molecular interaction-কেই computation-এর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
এই পদ্ধতির একটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো কম শক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ধরনের computation করা।
এছাড়া DNA অত্যন্ত ঘনভাবে তথ্য ধারণ করতে পারে। তাই গবেষকেরা ভবিষ্যতে এই ধরনের molecular computing-এর সঙ্গে DNA data storage-এর সংযোগ নিয়েও সম্ভাবনা দেখছেন।
ভবিষ্যতে মানুষের শরীরের ভেতরেও কি ব্যবহার করা যাবে?
এটি গবেষণাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্ভাবনাগুলোর একটি, তবে এখানে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আর বর্তমান প্রযুক্তির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।
Maynooth University-এর গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, ভবিষ্যতে molecular computing এমন ব্যবস্থার দিকে যেতে পারে যা জীবন্ত কোষের ভেতরে কাজ করবে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো কোষে নির্দিষ্ট molecular signal বা রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত biological marker শনাক্ত করে তার ভিত্তিতে একটি computation করার ধারণা রয়েছে।
তবে এই DNA computer এখন মানুষের শরীরের ভেতরে রোগ শনাক্ত করছে এমন নয়। এটি বর্তমানে একটি গবেষণাগারভিত্তিক molecular computing system।
DNA computer কি বারবার ব্যবহার করা যায়?
গবেষণাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর renewability।
গবেষকেরা কিছু molecular program-এ নতুন input দিয়ে একই system বারবার চালিয়েছেন। একটি পরীক্ষায় একটি program-কে ২৫ বার পর্যন্ত নতুন input দিয়ে পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য কিছু computation-ও একাধিকবার চালানো হয়েছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ molecular computer-এর ক্ষেত্রে একই system পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলা দীর্ঘদিন ধরেই একটি চ্যালেঞ্জ।
সামনে কী হতে পারে?
DNA computer এখনও গবেষণার পর্যায়ে। কিন্তু এই গবেষণা দেখিয়েছে, DNA শুধু জেনেটিক তথ্য বহন করার অণু নয়, সঠিকভাবে ডিজাইন করলে এটিকে programmable computing medium হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে DNA data storage, কম-শক্তির বিশেষায়িত computing, smart molecular systems কিংবা biological environment-এ computation-এর মতো ক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিয়ে গবেষণা এগোতে পারে।
তবে সেসব এখনো সম্ভাবনা। আজকের বাস্তবতা হলো, বিজ্ঞানীরা একটি ছোট পরিসরের DNA-based computer তৈরি করে দেখিয়েছেন, যা পানির মধ্যে DNA molecule-এর স্বাভাবিক রাসায়নিক আচরণ ব্যবহার করে গাণিতিক computation করতে পারে।
অর্থাৎ, কম্পিউটারের ভবিষ্যৎ হয়তো সবসময় সিলিকন চিপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কোনো একদিন জীবনের মৌলিক অণু DNA-ও কম্পিউটিংয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

