চাঁদের গায়ে নতুন বিশাল গর্ত, তৈরি হয়েছিল ২০২৪ সালে

চাঁদের পৃষ্ঠে নতুন একটি বিশাল গর্তের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আশ্চর্যের বিষয়, গর্তটি সম্প্রতি তৈরি হয়নি, প্রায় দুই বছর আগেই চাঁদের মাটিতে এর সৃষ্টি হয়েছিলো। NASA-এর Lunar Reconnaissance Orbiter (LRO) থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে নতুন এই গর্তটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।

গর্তটির নাম রাখা হয়েছে McGetchin crater। এর ব্যাস প্রায় ২২২ মিটার বা ৭২৮ ফুট এবং গভীরতা প্রায় ৪৩ মিটার বা ১৪১ ফুট। অর্থাৎ গর্তটির প্রস্থ প্রায় দু'টি ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি। NASA বলছে, চাঁদের পৃষ্ঠে এত বড় নতুন গর্ত তৈরি হওয়া বেশ বিরল ঘটনা।

গবেষকদের ধারণা, ২০২৪ সালের ১১ এপ্রিল থেকে ২২ মে-এর মধ্যে কোনো একসময় একটি মহাজাগতিক বস্তু চাঁদের ওই এলাকায় আঘাত হানে। সেটি গ্রহাণু কিংবা ধূমকেতুর কোনো অংশ হতে পারে। আঘাতের সময় বস্তুটি চাঁদের মাটিতে প্রচণ্ড শক্তিতে আছড়ে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে বিশাল একটি গর্ত তৈরি করে।

পৃথিবীর তুলনায় চাঁদের একটি বড় পার্থক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অনেক ঘন হওয়ায় মহাকাশ থেকে আসা ছোট অনেক বস্তু বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় পুড়ে যায় বা গতি হারায়। কিন্তু চাঁদের কার্যত কোনো ঘন বায়ুমণ্ডল নেই। ফলে মহাজাগতিক বস্তু সরাসরি চাঁদের পৃষ্ঠে আঘাত করতে পারে। এমন আঘাতেই সেখানে অসংখ্য crater বা গর্ত তৈরি হয়েছে।

তবে এই গর্তটি আবিষ্কারের গল্পটিই আরও আকর্ষণীয়। NASA-এর LRO বহু বছর ধরে চাঁদের চারপাশে ঘুরে তার পৃষ্ঠের ছবি তুলছে। ফলে একই এলাকার বিভিন্ন সময়ের ছবি বিজ্ঞানীদের হাতে রয়েছে। নতুন ও পুরোনো ছবির মধ্যে পার্থক্য খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা চাঁদের একটি অংশে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখতে পান।

NASA-এর তথ্য অনুযায়ী, বিজ্ঞানী Robert Wagner ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর LRO-এর তথ্য বিশ্লেষণের সময় প্রথম বিষয়টি লক্ষ্য করেন। চাঁদের একটি মানচিত্রে তিনি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল একটি অঞ্চল দেখতে পান। পরে আগের ছবির সঙ্গে সেটি মিলিয়ে দেখা হলে বোঝা যায়, সেখানে আগে এমন কোনো গর্ত ছিল না।

এরপর আরও বিস্তারিতভাবে ছবিগুলো পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, নতুন গর্তটির চারপাশে মাটি ও পাথরের উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে। কোনো মহাজাগতিক বস্তু চাঁদের পৃষ্ঠে আঘাত করলে গর্ত তৈরির পাশাপাশি আশপাশের মাটি ও পাথরও ছিটকে যায়। নতুন আবিষ্কৃত গর্তটির চারপাশে এমন ছিটকে পড়া উপাদানের স্তর বা ejecta blanket স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।

বিজ্ঞানীদের জন্য এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু নতুন একটি গর্ত খুঁজে পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চাঁদের পৃষ্ঠে কখন কোনো গর্ত তৈরি হয়েছে, সেটি যদি তুলনামূলকভাবে নির্ভুলভাবে জানা যায়, তাহলে মহাকাশ থেকে আসা বস্তু চাঁদের ওপর কত ঘন ঘন আঘাত করছে, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।

এই গর্তের ক্ষেত্রে সময়টাও তুলনামূলকভাবে নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। কারণ ২০২৪ সালের ওই সময়ের আগের LRO-এর ছবিতে গর্তটি ছিল না, কিন্তু পরবর্তী ছবিতে সেটি দেখা যায়। ফলে ১১ এপ্রিল থেকে ২২ মে ২০২৪-এর মধ্যেই আঘাতটি ঘটেছিল বলে বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করেছেন।

গর্তটির প্রভাব শুধু তার চারপাশের মাটিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। NASA-এর LRO-এর Diviner যন্ত্র গর্তটির আশপাশের তাপমাত্রাতেও পরিবর্তন শনাক্ত করেছে। প্রায় ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার বা চার মাইল বিস্তৃত এলাকায় রাতে আশপাশের এলাকার তুলনায় তাপমাত্রা প্রায় ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, আঘাতের কারণে চাঁদের ওপরের মাটির স্তর বা regolith-এর বৈশিষ্ট্য বদলে যাওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

নতুন গর্তটির নামকরণও করা হয়েছে বিশেষ একজন বিজ্ঞানীর নামে। Thomas McGetchin চাঁদ ও গ্রহবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছিলেন। বিশেষ করে কোনো মহাজাগতিক বস্তু চাঁদের পৃষ্ঠে আঘাত করার পর মাটি ও পাথর কীভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, সে বিষয়ে তাঁর গবেষণার সঙ্গে নতুন গর্তটির নামের সম্পর্ক রয়েছে।

বিজ্ঞানীদের হিসাবে, McGetchin crater-এর মতো বড় গর্ত চাঁদের পৃষ্ঠে তৈরি হওয়া খুব সাধারণ ঘটনা নয়। এ ধরনের একটি গর্ত তৈরি হতে গড়ে প্রায় ১৩০ বছর সময় লাগতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেই হিসাবে মানুষের হাতে থাকা চাঁদের পর্যবেক্ষণ তথ্যের মধ্যে এত বড় একটি নতুন crater শনাক্ত হওয়া বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

চাঁদকে আমরা প্রায়ই একটি স্থির ও অপরিবর্তনীয় জগৎ হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এর পৃষ্ঠ প্রতিনিয়ত মহাজাগতিক পরিবেশের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। ছোট-বড় গ্রহাণু, ধূমকেতুর টুকরো এবং অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু নিয়মিতই সেখানে আঘাত করছে। অধিকাংশ আঘাত এত ছোট যে পৃথিবী থেকে তা বোঝার কোনো সুযোগ নেই।

NASA-এর Lunar Reconnaissance Orbiter-এর মতো মহাকাশযান সেই পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে। বছরের পর বছর একই এলাকার ছবি সংগ্রহ করার কারণে বিজ্ঞানীরা এখন চাঁদের পৃষ্ঠে নতুন পরিবর্তন ঘটলে তা আগের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করে শনাক্ত করতে পারছেন।

McGetchin crater সেই প্রক্রিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০২৪ সালে চাঁদের মাটিতে তৈরি হওয়া গর্তটি তখন পৃথিবীর মানুষের চোখে ধরা পড়েনি। প্রায় দেড় বছর পর পুরোনো ও নতুন মহাকাশচিত্র পাশাপাশি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন।

চাঁদের পৃষ্ঠে এমন নতুন গর্তের সন্ধান ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। কারণ চাঁদে মানুষ বা অবকাঠামো পাঠানোর পরিকল্পনা যত এগোবে, মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতের ঝুঁকি এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে তত বেশি জানা প্রয়োজন হবে।

সব মিলিয়ে, চাঁদের গায়ে তৈরি হওয়া এই নতুন গর্ত আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীর আকাশে চাঁদকে যতটা শান্ত ও অপরিবর্তনীয় মনে হয়, বাস্তবে তার পৃষ্ঠ ততটা স্থির নয়। কোটি কোটি বছর ধরে মহাজাগতিক আঘাতে বদলে যাওয়া চাঁদের মাটিতে আজও নতুন ইতিহাস তৈরি হচ্ছে, আর আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা সেই পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে উঠছেন।

তথ্যসূত্র: NASA, Lunar Reconnaissance Orbiter (LRO); Lunar and Planetary Institute (LPI).